এক্সক্লুসিভ



নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই / ০৭ / ২০২৫


নির্বাচন যত দেরিতে হবে বাংলাদেশ তত পিছিয়ে যাবে : মির্জা ফখরুল


259

Shares


নির্বাচন যত দেরিতে হবে, বাংলাদেশ তত পিছিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচন না হলে বিনিয়োগ আসবে না, ইনভেস্টমেন্ট হবে না।’ 

আজ সোমবার (৭ জুলাই) সিলেট নগরের পাঠানটুলা এলাকায় একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত জনসভা ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘নির্বাচন না হলে আমাদের ছেলেদের কর্মসংস্থান বাড়বে না, আমার মা-মেয়েরা আরো বেশি নিরাপত্তা হারাবে। মব জাস্টিস বাড়বে। জুডিশিয়াল সিস্টেম আরো ভেঙে পড়বে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো ভেঙে পড়বে।’

যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমি যখনই সুযোগ পাই সিলেটে আসি। প্রধান কারণ হচ্ছে যারা আপনাদের এখানে যারা সেই শত শত বছর পুর্বে এখানে ইসলামের আলো ছড়িয়েছিলেন। যারা এখানে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ইনসাফকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-সেই হযরত শাহজালাল (রহ.), হযরত শাহপরান (রহ.) এর দরগাহে আমরা আসি। শুধু আমরা নয় সারা দেশ থেকে, বিদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ এখানে আসে। কেন আসে? কারণ এই যে মহান ব্যক্তিরা, যারা এখানের অন্ধকারকে আলোকিত করার জন্য সেই সিলেটে এসে ইসলামের মহান বাণী প্রচার করেছিলেন, মানুষকে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন সেই মহান মানুষগুলোকে তারা শ্রদ্ধা জানাতে চায়। এটা আমরা দেখেছি-বিরাট ব্যাপার। আমাদের পূণ্যভূমি। একই সঙ্গে সিলেট আমাদের কাছে আরো প্রিয়। কেন বলুন তো? আমাদের নেতা তারেক রহমানের শ^শুর বাড়ি। আমাদের নেতা আপনাদের দামান্দ, তাই না? সে কারণে এখানে আসলে আমরা খুব আনন্দ পাই। মনের মধ্যে শান্তি আসে আমাদের যে আমরা আমাদের তীর্থস্থানে এসেছি। ’

তিনি দুই প্রয়াত নেতাকে স্মরণ করে বলেন, ‘আমি আজকে স্মরণ করতে চাই আমার আরেকজন শ্রদ্ধার মানুষকে, সাইফুর রহমান সাহেবকে। যিনি সিলেটকে নতুন একটা আবয়ব দিয়েছিলেন এবং উন্নয়ন করেছিলেন, পথ দেখিয়েছিলেন। তারই দেখানো পথে সিলেট অনেকদূর এগিয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি এখানে স্মরণ করি আমার সেই ভাই, যে ভাই গণতন্ত্রের জন্য, দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছেন, ইলিয়াস আলী আমাদের মাঝে নাই। কোথায় তাও জানি না। এজন্য এখানে আসলে আমরা তাদের কথা স্মরণ করার চেষ্টা করি। চেষ্টা করি যে ভাই দিনার গুম হয়ে গিয়েছিল। আসি তাদের শ্রদ্ধা জানাতে যারা চব্বিশে শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন। তারও আগে ১৫ বছর এই সিলেটে আমাদের বহু নেতাকর্মী ভাই গণতন্ত্রের জন্য বুকের রক্ত রাস্তায় ঢেলে দিয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে। এখানে মঞ্চে যারা বসে আছেন তাদের অনেককে হাতে পায়ে বেড়ি লাগিয়ে মাসের পর মাস তাদের কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে।’

সিলেটের যুদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাতে সিলেট আসেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই ২৪ সালে মোট ১৩ জনের বেশি আমার ভাই আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছে শেখ হাসিনা। আমরা লড়াই করছি, সংগ্রাম করছি আমাদের অধিকারে জন্য। ভোটের অধিকারের জন্য। গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। সেই লড়াইয়ে যারা যুদ্ধা ছিলেন তাদের শ্রদ্ধা জানাতে আমরা সিলেটে আসি।’

তিনি বিএনপি নেতা এম এ মালিকের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘এম এ মালিক শুধু এই সভার সভাপতি নয় তিনি যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি। শুধু তাই নয় তিনি ১৫ বছর বিএনপির ঝাণ্ডা তুলে গোটা ইউরোপ তিনি চষে বেড়িয়েছেন। এটা অস্বীকার কারার কোনো উপায় নেই। তাই তিনি যখন আমন্ত্রণ জানালেন, আমাদের চেয়ারম্যান বললেন যদি যেতে পারেন তাহলে সিলেটের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। বলেছি, আমি আসতে চাই। কারণ আমার অন্তর থেকে টান অনুভব করেছি।’

তিনি বলেন, ‘এমনি এমনি হঠাৎ করে হাসিনা পালায়নি। বহু দিনের সংগ্রাম, গণমানুষের ত্যাগ স্বীকার, বহু মানুষের রক্ত, বহু মানুষের কান্না সবমিলিয়ে আমরা ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছি। ফ্যাসিবাদ মুক্ত হলাম ঠিক আছে, এখন করবটা কি? এখন আমাদের লড়াইটা হচ্ছে গনতন্ত্রের লড়াই। অর্থাৎ আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেখানে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। যেখানে মানুষ কথা বলতে পারবে-বাক স্বাধীনতা থাকবে। যেখানে আমার ছেলেরা কাজের শুরু পাবে, আমাদের মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, আমাদের ছেলেরা লেখাপড়ার সুযোগ পাবে। আমাদের মা-বোনেরা তাদের সন্তানদের চিকিৎসা করানোর জন্য হাসপাতাল পাবে। এইরকম একটা রাষ্ট্র আমরা চাই, সেইরকম একটা দেশ আমরা চাই। সেই দেশ গড়ার জন্য প্রচুর আন্দোলন সংগ্রাম করেছি আমরা বন্ধুগণ। সেই আন্দোলন সংগ্রামে আমাদের নেতা হচ্ছেন তরুণ নেতা তারেক রহমান সাহেব। আমাদের দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আমাদের দীর্ঘকাল নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখনো অসুস্থ অবস্থায় ঘরে বসে আমাদের নির্দেশনা দেন গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ’

বিএনপির অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা সেই দল যেই দল এদেশে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। যার প্রতিষ্টাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আমরা সেই দল যে দলের  প্রতিষ্ঠাতা এদেশে বহুদলী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আওয়ামী লীগ বড় বড় কথা বলে, শেখ মুজিব তো একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল করেছিলেন। মানুষের সব অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। পত্রপত্রিকার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। এই যে অসংখ্য মিডিয়া দেখতে পাচ্ছেন এই মিডিয়া সব বন্ধ করে দিয়েছিল। বলেছিল, শুধু চারটা থাকবে আর কোনো মিডিয়া থাকবে না। মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করেছিল, মানুষের সুযোগ সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এসে আমাদের বাক স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন। অর্থনীতিকে গড়ে দিয়েছিলেন।’

বিএনপির ৩১ দফায়ই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমরা একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই। আমরা আমাদের তরুণ, যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। আমরা বাংলাদেশকে একটা উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাই। সেজন্য আমরা বিএনপি থেকে ৩১ দফা দিয়েছি। এই ৩১ দফার মধ্যেই আছে বাংলাদেশের ভবিষ্যত, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। যে স্বপ্ন আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমরা কি চিরকাল পেছনে থাকব, চিরকাল সেই নিচু হয়ে থাকব? আমরা সামনের দিকে এগুতে চাই। আমাদের ছেলেরা তৈরি হয়ে গেছে। তারা এখন সামনের দিকে এগুতে চাই। সেজন্য বিএনপিকে দায়িত্ব নিতে হবে। সেই নেতৃত্ব দিতে হবে। যে নেতৃত্বে একটা নতুন বাংলাদেশ আমরা গড়তে পারব। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। যে স্বপ্ন আমাদের দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দেখেছেন। আমাদের তরুণ নেতা তারেক রহমান দেখাচ্ছেন। ’

তবে তা সহজ হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সহজে হবে না। শত্রু অনেক, বাঁধা দিতে চায়,  আটকাতে চায়, দেরি করতে চায়। আমাদের সেগুলো পাড়ি দিতে হবে। আমি পরিস্কার ভাষায় বলতে চাই- সরকারকে বলতে চাই, অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে বলতে চাই, যদি নির্বাচনের দেরি হবে তত বাংলাদেশ পিছিয়ে যাবে। বিনিয়োগ আসবে না, ইনভেস্টমেন্ট হবে না। আমাদের ছেলেদের কর্মসংস্থান বাড়বে না, আমার মায়েরা মেয়েরা আরো বেশি নিরাপত্তা হারাবে। মব জাস্টিস বাড়বে। জুরিসিয়াল সিস্টেম আরো ভেঙে পড়বে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো ভেঙে পড়বে। সেজন্য দরকার একটা নির্বাচিত সরকার। যে সরকারের পেছনে মানুষ আছে, যে সরকারের পেছনে জনসমর্থন আছে। বন্ধুগণ মনে রাখবেন- নির্বাচিত সরকারের চেয়ে শক্তিশালী আর কোনো সরকার হতে পারে না।’

ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আশা রেখে তিনি বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই আমাদের অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান  উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুসকে। তিনি আমাদের নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনে কথা বলেে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটা সময় নির্ধারণ করেছেন।’

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনাদের দায়িত্ব কি? খালি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করবেন? এখন থেকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেন। সেই প্রস্তুতিটা কি? মানুষের মধ্যে ভালোবাসা তৈরি করেন। বিএনপিকে যাতে মানুষ ভালোবাসে। বলে হ্যা, বিএনপি ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নাই। এই জিনিসটাকে আমাদের তৈরি করতে হবে। সেজন্য আপনারা কম ত্যাগ স্বীকার করেননি। আমি জানি এখনো সিলেটে অনেক অসংখ্য মামলা আছে, প্রত্যাহার হয়নি। অনেকের সংসার নষ্ট হয়ে গেছে, ব্যবসা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই আমি আপনাদের কাছে আবেদন জানাতে চাই- আসুন আমাদের যাকে কেউ খারাপ বলতে না পারে, আমাদের দিকে আঙ্গুল তুলে কেউ যাতে বলতে না পারে-ওরা খারাপ কাজ করছে। ব্যবসা নষ্ট করেছি, চাদাবাজি করেছি এই কথা যেন কেউ বলতে না পারে। ’



ওয়াইএফ/০১

এক্সক্লুসিভ