মতামত



সিনা তুসি

মার্চ / ১৪ / ২০২৬


ইরানের ‘কৌশলগত ধৈর্য’ কৌশল ব্যর্থ—এর পর যা ঘটতে পারে তা আরও ভয়াবহ হতে পারে


48

Shares


বহু বছর ধরে ইরানের নেতারা মনে করতেন, সময় তাদের পক্ষেই রয়েছে।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর—যা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA) নামে পরিচিত—তেহরান কার্যত এমন একটি নীতি গ্রহণ করে, যাকে পরে “কৌশলগত ধৈর্য” বলে অভিহিত করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজনা বাড়িয়ে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে, ইরান অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার পথ বেছে নেয় এবং অপেক্ষা করতে থাকে—কূটনীতি আবারও পুনরুজ্জীবিত হয় কি না তা দেখার জন্য।

এই কৌশলের পেছনের যুক্তি ছিল সহজ: একসময় ওয়াশিংটন বুঝতে পারবে যে ইরানের সঙ্গে সংঘাত তাদের নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী। কিন্তু আজ সেই ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

কূটনীতির ভাঙন এবং যুদ্ধের সূচনা ইরানের নেতৃত্বকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে: যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত যুক্তিসঙ্গত আচরণ করবে—এই বিশ্বাসটি হয়তো ছিল একটি বড় ধরনের ভুল হিসাব।

বর্তমান সংঘাত থেকে যদি ইরান টিকে বেরিয়ে আসে, তাহলে এই সময় থেকে নেওয়া শিক্ষা তাদের নেতৃত্বকে পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের পথে এগোতে উৎসাহিত করতে পারে।


অপেক্ষার কৌশল

২০১৮ সালে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন যখন JCPOA থেকে সরে গিয়ে “সর্বোচ্চ চাপ” নীতি চালু করে, তখন তেহরান শুরুতে বড় ধরনের পাল্টা উত্তেজনা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকে। প্রায় এক বছর ধরে তারা চুক্তির সীমার মধ্যেই থাকে, এই আশায় যে অন্য স্বাক্ষরকারী দেশগুলো—বিশেষ করে ইউরোপীয়রা—যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চুক্তিটি টিকিয়ে রাখতে পারবে এবং প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করবে।

কিন্তু তা ব্যর্থ হলে তেহরান ধীরে ধীরে তার পারমাণবিক কার্যক্রম বাড়াতে শুরু করে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বৃদ্ধি করা এবং চুক্তির শর্ত মানা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা—এই পথে এগোয় তারা, যদিও তখনও পুরোপুরি চুক্তি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়নি।

ইরানের শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহ হত্যার পর, দেশটির রক্ষণশীলদের নিয়ন্ত্রিত সংসদ পারমাণবিক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর আইন পাস করে। এরপর ২০২১ সালে রক্ষণশীল নেতা এব্রাহিম রাইসির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া এই পরিবর্তনকে আরও জোরদার করে।

এই পদক্ষেপগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল আলোচনার ক্ষেত্রে নতুন করে প্রভাব বা চাপ তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলা। তেহরানের ধারণা ছিল, বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে তাদের পক্ষেই বদলাচ্ছে।

তাদের দৃষ্টিতে চীনের উত্থান, রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান দৃঢ়তা এবং পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরে বাড়তে থাকা বিভাজন—সবই ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে ওয়াশিংটনের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

একই সময়ে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর নীতিও অনুসরণ করে। আগে যারা যুক্তরাষ্ট্রের “সর্বোচ্চ চাপ” নীতিকে সমর্থন করেছিল, সেই উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালায় তেহরান।

২০২০-এর দশকের শুরুতেই উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের অনেক দেশ ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো ও সম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে। এর একটি বড় উদাহরণ ছিল ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন।

এই প্রেক্ষাপটে উত্তেজনা বাড়লেও তেহরান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে বছরের পর বছর আলোচনার পরও JCPOA পুনরুজ্জীবিত করার কোনো চুক্তি হয়নি। পরে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও ভেঙে পড়ে।

এই নীতির পেছনে একটি মৌলিক ধারণা কাজ করছিল: যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের চেয়ে স্থিতিশীলতাকেই প্রাধান্য দেবে। ইরানি কর্মকর্তাদের বিশ্বাস ছিল, ওয়াশিংটন একসময় বুঝবে—অন্তহীন চাপ বা বড় যুদ্ধের বদলে কূটনীতিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং কম ব্যয়বহুল পথ।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা সেই ধারণার গভীর ভুলটিই প্রকাশ করে দিয়েছে।


প্রতিরোধের প্রত্যাবর্তন

যদিও তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির যুক্তিসঙ্গততার বিষয়ে ভুল ধারণার ওপর তার কৌশল দাঁড় করিয়েছিল, ওয়াশিংটনও পরিস্থিতিকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করছে।

বহু বছর ধরে “সর্বোচ্চ চাপ” নীতির সমর্থকেরা দাবি করে আসছিলেন যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ একসময় ইরানের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ভেঙে দেবে। কেউ কেউ এমনও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে যুদ্ধ শুরু হলে ব্যাপক জনঅস্থিরতা দেখা দেবে এবং শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

এখন পর্যন্ত সেই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর কোনোটিই সত্য হয়নি।

ইরানি সমাজের ওপর বিপুল চাপ থাকা সত্ত্বেও শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং বাহ্যিক আক্রমণের মুখে ইরানের রাজনৈতিক ভিত্তি—এবং অনেক ক্ষেত্রে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী—আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

এদিকে ইরান দীর্ঘদিন ধরে তার প্রতিরোধ সক্ষমতাও জোরদার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন কর্মসূচির সম্প্রসারণ ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেদ করার জন্য একাধিক আক্রমণ ব্যবস্থা তৈরি।

২০২৪ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এবং ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধ থেকে ইরানি পরিকল্পনাকারীরা নানা শিক্ষা নেয়। তারা লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের নির্ভুলতা বাড়ায় এবং বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় উন্নত করে।

ধীরে ধীরে কৌশলটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের প্রস্তুতির দিকে মোড় নেয়—যেখানে কম সংখ্যক কিন্তু আরও নিখুঁত হামলা চালানো হবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শত্রুপক্ষের রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দেওয়া হবে।

আজ সেই প্রস্তুতির ফল দেখা যাচ্ছে। ইরান তার প্রতিপক্ষদের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছে। পাল্টা হামলায় সাতজন মার্কিন এবং ১১ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি হয়েছে, কারণ প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত কমে যাচ্ছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অঞ্চলজুড়ে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো—যেমন রাডার স্থাপনাও রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।


সম্ভাব্য নতুন পথ

যুদ্ধের বিপুল মূল্য ছাড়াও, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি ডেকে আনতে পারে—ইরানের কৌশলে এক মৌলিক পরিবর্তন।

দশকের পর দশক ধরে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম দিনেই তার হত্যাকাণ্ড দেশের নতুন বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বকে পারমাণবিক নীতি পুনর্বিবেচনার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

পারমাণবিক অস্ত্র অনুসরণের ক্ষেত্রে আদর্শগত আপত্তিও এখন কমে যেতে পারে। যুক্তিটা সহজ: যদি কূটনীতি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে না পারে বা যুদ্ধের হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করতে না পারে, তাহলে পারমাণবিক প্রতিরোধই একমাত্র কার্যকর বিকল্প বলে মনে হতে পারে।

এই সংঘাতে ইরানের পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে অনেক নেতা এখন ধৈর্য ও কূটনীতিকে কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখছেন। এর মধ্যে রয়েছে পুরো অঞ্চলে নজিরবিহীন মাত্রায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা, এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—বিশেষ করে মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ।

খামেনির ছেলেকে এই পদে বসানো একটি দীর্ঘদিনের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ভেঙেছে। যে ব্যবস্থাটি বংশগত শাসনের বিরোধিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে এই সিদ্ধান্ত নেতৃত্বের এমন একটি অবস্থানকে প্রতিফলিত করে যা আগের অনেক সীমাবদ্ধতা ত্যাগ করতে প্রস্তুত।

যদি পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা নীতির মূল ভিত্তি হিসেবে সংলাপের জায়গায় প্রতিরোধের এই শূন্য-সম মানসিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আরও বিপজ্জনক এক যুগে প্রবেশ করতে পারে—যেখানে পারমাণবিক অস্ত্রকে চূড়ান্ত প্রতিরোধের মাধ্যম হিসেবে দেখা হবে এবং পারমাণবিক বিস্তার আর থামানো সম্ভব হবে না।


[এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব; এটি আল জাজিরার সম্পাদকীয় অবস্থানকে অবশ্যই প্রতিফলিত করে না।]



-----

সিনা তুসি

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ননরেসিডেন্ট ফেলো

সিনা তুসি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির একজন সিনিয়র ননরেসিডেন্ট ফেলো। তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্ক, ইরানের রাজনীতি ও সমাজ এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ (নন-প্রলিফারেশন) বিষয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি করেন।

তার লেখা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে Foreign Affairs, Foreign Policy, The Guardian এবং Al Jazeera English।

মতামত