মতামত



জন টি. স্যারোপোলাস

জুন / ২৫ / ২০২৫


বারো দিনের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ কি সত্যিই শেষ? কার লাভ, কার ক্ষতি?


356

Shares


রবিবার থেকে মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত থেকে যুদ্ধবিরতিতে ফিরে এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেটিকে ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ বলেছেন, সেই ইসরায়েল-ইরান সংঘাত আপাতত শেষ – অন্তত এখনই।

এদিকে ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ইরানের নেতৃবৃন্দ সকলেই দাবি করেছেন, এই বিরতি তাদের শর্তেই হয়েছে।

তাহলে বাস্তবতা কী? ইসরায়েল কী অর্জন করল? ইরান কি তাদের কৌশলগত স্থাপনাগুলো রক্ষা করতে পেরেছে? আর এই যুদ্ধবিরতি কি শান্তির পথে এক ধাপ?


যেভাবে যুদ্ধের গতিপথ বদলালো

শনিবার গভীর রাতে, ইসরায়েলের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের অংশ নেয় এবং ইরানের ফরদো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ট্রাম্পের ভাষায়, এই হামলায় সেগুলো “সম্পূর্ণ ধ্বংস” হয়ে যায়।

সোমবার ইরান পাল্টা জবাব দেয়, কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটি আল উদেইদে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।

মনে হচ্ছিল, পুরো মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে।

কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প তার Truth Social প্ল্যাটফর্মে ঘোষণা দেন, “ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি নিয়ে পূর্ণ সম্মতি হয়েছে।”

তিনি এটিকে বলেন “১২ দিনের যুদ্ধ ... যা বহু বছর ধরে চলতে পারত এবং মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংস করে দিতে পারত।”

কিন্তু যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার চার ঘণ্টা পরই ইসরায়েল আবার হামলা চালায়, তাদের দাবি ইরান থেকে উৎক্ষেপিত দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের জবাবে। উভয় ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত হয়, কিন্তু প্রতিশোধে ইসরায়েল তেহরানের কাছে একটি রাডার স্টেশন ধ্বংস করে।

এতে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন। “ইসরায়েল আজ সকালে যা করল, তাতে আমি সত্যিই অসন্তুষ্ট,” তিনি বলেন। “দুইটি দেশ এতদিন ধরে যুদ্ধ করছে যে তারা নিজেরাও জানে না তারা কী করছে।”

ইরান দাবি করে, তারা ওই ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়েনি। দুপুর ১১:৩০ জিএমটি’র দিকে যুদ্ধবিরতি আবার কার্যকর হয়। ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেন।

তিনি Truth Social-এ লেখেন: “ইসরায়েল আর ইরানকে আক্রমণ করবে না। সব বিমান ফিরে যাবে, এবং একটি ‘বন্ধুত্বসূচক বিমান তরঙ্গ’ দেখাবে ইরানকে। কেউ আহত হবে না। যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে!”


যুদ্ধ থেকে ইসরায়েল কী অর্জন করল?

ইসরায়েল বরাবরই বলে আসছে, ইরান তাদের অস্তিত্বের জন্য প্রধান হুমকি। তবে তারা আগে কখনও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সরাসরি হামলা চালায়নি।

১৩ জুন তারা সেই লাল রেখা পার করে। তারা নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের পারমাণবিক প্রযুক্তি কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। জবাবে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।

ইসরায়েল এর আগেও সিরিয়া ও ইরাকে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, কিন্তু এবার আরও দূরবর্তী, জটিল মিশন তারা সফলভাবে পরিচালনা করেছে।

তারা আন্তর্জাতিক সমালোচনাকেও সহ্য করেছে। যদিও ইসরায়েল এটিকে আত্মরক্ষামূলক পূর্ব সতর্কতামূলক হামলা হিসেবে দাবি করে, তবে সবাই একমত নন যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাচ্ছিল বা তা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে যাচ্ছিল।

“আমি বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তারা আমাদের দৃঢ়তা ও আমাদের বাহিনীর সাফল্যে মুগ্ধ,” নেতানিয়াহু বলেন ১৮ জুন।

ইসরায়েল প্রমাণ করেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে চাইলে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে টেনে আনতে পারে – এমন কিছু যা ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের যুদ্ধেও ঘটেনি।

নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান “আমাদের পাশে থাকার জন্য”।

“অপারেশন রাইজিং লায়ন” পরিচালিত হয় ইরানের আঞ্চলিক সহযোগীদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে – যেমন ইয়েমেনের হুথি, গাজার হামাস এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ। হামাস ও হিজবুল্লাহ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্বল হয়ে পড়েছে।


ইরান কি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি রক্ষা করতে পেরেছে?

ইসরায়েল ইরানে বেশ কিছু উপরের স্থাপনায় আঘাত হানে, এবং যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে তারা ভূগর্ভস্থ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করেছে।

কিন্তু স্যাটেলাইট ছবি দিয়ে বোঝা গেলেও কী ধ্বংস হয়েছে তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। এর জন্য সরেজমিন পরিদর্শন দরকার।

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেন, “বর্তমানে কেউ – এমনকি IAEA-ও – ফরদোর ভূগর্ভস্থ ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ মূল্যায়ন করতে পারেনি।” তিনি আরও বলেন, “এই ধরনের বিস্ফোরণ ও সেন্ট্রিফিউজের স্পর্শকাতরতার কারণে প্রচুর ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে।”

এছাড়াও এখনও অজানা, IAEA-র মতে ইরানের কাছে থাকা ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থান কোথায়।

ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামি বলেন, “আমরা আগেই পুনরুদ্ধারের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, এবং আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে উৎপাদন বা সেবায় কোনো ব্যাঘাত না হতে দেওয়া।”

এদিকে, যুদ্ধবিরতির তিন ঘণ্টা পর যে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলে পড়েছিল, সেগুলোর উৎস এখনও অজানা। ইরান সরকার সেগুলো ছোড়ার কথা অস্বীকার করেছে।

তাহলে কে ছুড়েছিল? ভুল করে নাকি? যেমন ২০২১ সালে ভুল করে ইরান একটি ইউক্রেনের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করেছিল।


আবার হামলার সম্ভাবনা কতটা?

ইসরায়েল ও ইরান কেবল যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছে – শান্তিচুক্তিতে নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সামনে দুটো পথ খোলা:

১. জাতিসংঘের নতুন পরিদর্শন ও একটি নতুন চুক্তি, যেমন ২০১৫ সালের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি (JCPOA)। যদিও সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন।

এই পথে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ও জার্মানি – তিনটি দেশই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ২০ জুন বৈঠক করেছে। যদিও তারা মার্কিন হামলা ঠেকাতে পারেনি, তবে তারা কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

জিওপলিটিকস বিশেষজ্ঞ ইয়োআনিস কোটুলাস বলেন, ‘ইরান ইউরোপকে সম্পৃক্ত করতে চাইবে, পারমাণবিক কর্মসূচির উপর অতিরিক্ত নজরদারি ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র হয়তো একটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি মেনে নেবে – মার্কো রুবিও এরই মধ্যে সায় দিয়েছেন। ইউরোপ এখন ইরানের একমাত্র কূটনৈতিক রাস্তা। রাশিয়া নির্ভরযোগ্য নয়।”

কিন্তু ইসরায়েল আগেও যেকোনো পারমাণবিক চুক্তি বানচাল করতে চেয়েছে, এবং তারা নতুন কোনো চুক্তি সহজে মেনে নেবে না।

আর ইরানই বা রাজি হবে কেন? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগের চুক্তি বাতিল করেছে, শর্ত বদলেছে এবং চুক্তির মাঝেই ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা বর্ষণ করেছে।

“সব কিছু দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও কিভাবে ‘পিছু হটা’ ব্যাখ্যা করা হয়, তার উপর নির্ভর করে। তবে এরই মধ্যে ইরানের অভ্যন্তরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ বন্ধের দাবি উঠেছে,” বলেন অধ্যাপক আলি আনসারি।

তবে এখন পর্যন্ত ইরান তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার দিকেই অঙ্গীকারবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে।

সোমবার ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি একটি বিল অনুমোদন করেছে, যেখানে IAEA-র সঙ্গে সহযোগিতা পুরোপুরি বন্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

মঙ্গলবার ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় আবার জোর দিয়ে বলেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু করতে দেবেন না।

এই মৌলিক সংঘাত যদি অটুট থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আরেক দফা হামলা-প্রতি হামলা ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ সময়ের ব্যাপার মাত্র।


ওয়াইএফ//০১

মতামত