106
Shares‘যোগি, মোদি সরকারে যেই থাকুন, যেখানেই থাকুন, আমাদের বাঁচান’, বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন ভারতের লখনৌর গরিমা মিশ্র। ইউক্রেনে আটকে থাকা ভারতীয় ছাত্রী। হাতজোড় করে ‘জয় হিন্দ, জয় ভারত’ বলে সাহায্যের প্রার্থনা করছেন। ধরা গলায় বলছেন, ‘আমাদের এখান থেকে কোথাও যাওয়া নিরাপদ নয়। এখানে থাকাও নিরাপদ নয়।’
নরেন্দ্র মোদি সরকার ‘অপারেশন গঙ্গা’ নামক ইউক্রেন থেকে ভারতীয় পড়ুয়াদের উদ্ধার অভিযানের প্রচার শুরু করে দিলেও, ইউক্রেনে আটকে থাকা পড়ুয়াদের এই ধরনের অসংখ্য ভিডিও-বার্তায় স্পষ্ট, তারা কতটা অসহায়, অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছেন। ইউক্রেনের রাজধানী কিভ-এ বাঙ্কারে আটকে থাকা গরিমা জানিয়েছেন, পড়ুয়াদের একটি দল গাড়িতে কিভ থেকে সীমান্তের দিকে রওনা দিয়েছিলেন। রাশিয়ার সেনাবাহিনী ওই গাড়ি আটকে গুলি চালিয়েছে এবং তারপর মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়েছে বলে তার বক্তব্য। কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কেউ জানে না। ওই দলের ছাত্রদেরও কোনো খোঁজ নেই।
তাদের আরও কিছু বন্ধুবান্ধব ইউক্রেন-রোমানিয়া সীমান্তে পৌঁছলেও সেখানে তাদের মারধর করা হয়েছে। গরিমা বলেন, ‘আমরা তো ভাবতাম, মোদি বা যোগি সরকার আমাদের উদ্ধার করবে। সিনেমায় দেখতাম, বিদেশে আটকেপড়া ভারতীয়দের উদ্ধার করা হচ্ছে। এখন আর তা মনে হচ্ছে না। জানি না কী হবে। সরকারে যিনিই থাকুন, যেখানেই থাকুন, আমাদের বাঁচান। সেনা পাঠান।’ আর এক ছাত্রীও ভিডিও বার্তায় অভিযোগ করেছেন, তারা কোনোভাবেই ইউক্রেনে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। ফোন করলেও ফোন কেটে দেওয়া হচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপ-এ মেসেজ করলেও উত্তর মিলছে না। ওই ছাত্রী বলেন, ‘ভারত সরকার কিছু করছে না। আমাদের বলা হচ্ছে, ইউক্রেনের পশ্চিম সীমান্তে চলে যেতে।
এখান থেকে সীমান্ত ৮০০ কিলোমিটার। রোমানিয়ার সীমান্তে ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের মারধর করা হচ্ছে। অন্য দেশগুলি নিজেদের শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে। ভারত সরকার কোনো সাহায্য করছে না।’ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তারা যেখানে আটকে রয়েছেন, সেখানে রাতে এসে হামলা হচ্ছে। গেট ভেঙে ঢোকার চেষ্টা হচ্ছে। কী হতে চলেছে, কেউই কিছু বুঝতে পারছেন না। বেশ কিছু শিক্ষার্থী ভিডিও টুইট করে জানিয়েছেন, ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের ইউক্রেনের সীমান্তে লাঠি দিয়ে পেটানো হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদি গতকাল সোমবার উত্তরপ্রদেশের প্রচারে গিয়ে ‘অপারেশন গঙ্গা’-র ঢাক পিটিয়েছিলেন।
বিমানে ফেরা ছাত্রছাত্রীদের সামনে গিয়ে মোদি সরকারের মন্ত্রীরা প্রচার করছেন, কীভাবে প্রধানমন্ত্রী রাশিয়া, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলে ভারতীয় নাগরিক, শিক্ষার্থীদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। উল্টো দিকে শিক্ষার্থীদের এই দুরবস্থার ছবি প্রকাশ্যে আসায় আজ মোদি সরকারকে ঘরে-বাইরে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, ‘ইউক্রেনে আটকে থাকা ভারতীয়দের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। অথচ, ভারত সরকার তাদের ঘরে ফেরাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ করছে না।
’ রাহুলের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী এবারেও ‘মিসিং ইন অ্যাকশন।’ কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের ওপরে লাঠির আঘাত দেশের সম্মানের ওপরে আঘাত। প্রধানমন্ত্রী কেন উত্তরপ্রদেশের ভোটের প্রচার ছেড়ে ইউক্রেনের শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে পুরো সময় দিচ্ছেন না? বিজেপির সংসদ সদস্য বরুণ গান্ধীর অভিযোগ, ‘ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলেই ১৫ হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে দুরবস্থায় পড়ে রয়েছেন।’ উদ্ধার অভিযানকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলারও সমালোচনা করেছেন বরুণ। প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে তার বক্তব্য, সব সংকটের মধ্যে সুযোগ খোঁজা উচিত নয়। সুনির্দিষ্ট কৌশল ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে ফেরানো তাদের উপকার করা নয়, বরং এটাই সরকারের দায়িত্ব। বাজপেয়ী সরকারের মন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতা যশবন্ত সিনহা বলেন, ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের সময় ১ লাখ ৭০ হাজার ভারতীয়কে উদ্ধার করে দেশে নিয়ে আসা হয়েছিল।
তা নিয়ে কেউ বুক বাজিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করেননি। ইউক্রেনের কিভ, খারকিভের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরগুলি থেকে যারা পোল্যান্ড, রোমানিয়ার সীমান্তে পৌঁছতে পেরেছেন, তাদের অভিযোগ, সেখানে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের মুখে পড়ছেন। ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের সীমান্ত পার হতে দেওয়া হচ্ছে। ভারতীয়রা কম সুযোগ পাচ্ছেন। সোমবার কিভ থেকে ট্রেন চালু হওয়ায় ভারতীয় দূতাবাস থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়, শিক্ষার্থীরা যেন ট্রেনে চেপে ইউক্রেনের পশ্চিমে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন।
ছাত্রছাত্রীরা সুটকেস, ব্যাগ টানতে টানতে হেঁটে হেঁটেই স্টেশনের দিকে রওনা দিয়েছেন। তাদের জন্য গাড়ির বন্দোবস্ত ছিল কি না, প্রশ্ন করায় এক ছাত্রী ক্ষুব্ধ কণ্ঠে সাংবাদিককে উত্তর দিয়েছেন, ‘দেখতেই তো পাচ্ছেন, ভারতীয় দূতাবাস কী রকম কাজ করছে।’ প্রশ্নের মুখে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচী যুক্তি দিয়েছেন, ভারতীয় দূতাবাস যে কিভে যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে কাজ করছে, তা বুঝতে হবে। শিক্ষার্থীরা ফোন করলেও দূতাবাসের কেউ ফোন ধরছেন না, অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ইউক্রেনের দূতাবাসের কর্মী, ইউক্রেনের আশপাশের দেশ থেকে সীমান্তে পৌঁছে যাওয়া ভারতীয় কর্মীদের মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত ফোন আসছে যে সব ফোন ধরা সম্ভব হচ্ছে না।
ফোন ধরা ছাড়া তাদের অন্য কাজও করতে হচ্ছে। তাই কন্ট্রোল রুমের নম্বর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা সেখানে যোগাযোগ করলে তাদের সাহায্য করা হবে। ইউক্রেনের পশ্চিম সীমান্তে পৌঁছলেও যে শিক্ষার্থীদের সীমান্ত পার হতে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে, তা মেনে নিচ্ছেন অরিন্দম। তার বক্তব্য, লাখ লাখ মানুষ একইসঙ্গে সীমান্তে এসে জড়ো হচ্ছেন।
ফলে প্রবল ঠাণ্ডার মধ্যে সীমান্তে দু-তিনদিন আটকে থাকতে হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ, তারা কিভ, খারকিভের মতো ‘কনফ্লিক্ট জোন’ থেকে ইউক্রেনের পশ্চিম প্রান্তে শান্তিপূর্ণ এলাকায় সরে এলেও প্রথমেই সীমান্তে পৌঁছে যাওয়ার দরকার নেই। আশপাশের শহরে আশ্রয় নেওয়া ভালো। তারপর ভারতীয় দূতাবাসের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, নির্দেশ মতো সীমান্তে পৌঁছলে তাদের ইউক্রেন থেকে বের করে অন্য দেশে নিয়ে আসার চেষ্টা হবে। সূত্র: আনন্দবাজার।